রাজউক বিধিমালা: যা কিছু জানতে হবে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

রাজউক বা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজধানী ঢাকার সকল উন্নয়ন পরিকল্পনার দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমান রাজউক গঠিত হয় ৩০ এপ্রিল ১৯৮৭ সালে। তবে পাকিস্তান আমল থেকে DIT বা Dhaka Improvement Task নামে সংস্থাটি কাজ করে আসছিল। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠানটির একটি অন্যতম কাজ হচ্ছে ভবন নকশার অনুমোদন দেওয়া। তাই ঢাকায় যেকোনো ভবন নির্মাণের আগে তার নকশা রাজউকে জমা দিতে হয় ও অনুমোদন নিতে হয়। একারণে ভবন নির্মাণের আগে তার নকশাও রাজউকের বিধিমালা অনুসারে তৈরি হওয়া আবশ্যক।

নির্মাণের অনুমোদন পেতে, যেকোনো ভবনের নকশা মূলত দুটি আলাদা বিধানের কোনো অংশের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া অত্যাবশ্যক।

১. Bangladesh National Building Code (বাংলাদেশের ভেতরে যেকোনো স্থানে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এটি মানতে হবে)

২. রাজউক ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ঢাকা শহরের ভিতরে, BNBC এর পাশাপাশি এই নিয়মগুলোও মানতে হবে)

BNBC

এই অঞ্চলে ইমারত নির্মাণের জন্য Public Works Department প্রথম বিধিমালা প্রণয়ন করে ১৯৫২ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সেই বিধিমালার আলোকেই BNBC প্রণয়ন করা হয় ও এটি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি গেজেটেড আইন এবং বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে ভবন নির্মাণের প্রশ্নে এর প্রতিটি ধারার সাথে ভবনের নির্মাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। এই বিধিমালা বাংলাদেশ গেজেটের অন্তর্ভুক্ত ও পুস্তিকা আকারে কিনতে পাওয়া যায়।

রাজউক ইমারত নির্মাণ বিধিমালা

রাজধানী ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশানের অধীনে ভবন করতে এই অঞ্চলের জন্য আলাদা বিধিমালা রয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্য সিটি কর্পোরেশনের জন্য, প্রতিটি পৌরসভার জন্য আলাদা আলাদা ভবন নির্মাণের বিধিমালা রয়েছে একইভাবে। জমির এলাকা নির্ধারণ সাপেক্ষে রাজউক, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা হতে এই বিধিমালা সংগ্রহ করা যায়।

মনে রাখতে হবে, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের বিধিমালা ভঙ্গ করে কোনো ভবন বা অংশবিশেষ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশের আইনে সেই ভবন বা অংশবিশেষ অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যেকোনো সময় তদন্ত করতে পারেন এবং ত্রুটিপূর্ণ বা অননুমোদিত নকশার উপর ভিত্তি করে তৈরি বা অনুমোদিত নকশা ভঙ্গ করে নির্মাণ করা অংশ নোটিশ প্রদান সাপেক্ষে ভেঙে ফেলতে পারেন।

সিটি কর্পোরেশনে বা পৌরসভায় অনুমোদনের ব্যাপারে করণীয় কী?

প্রথমত চাই একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা। ভবনের নকশা করার জন্য একজন প্রশিক্ষিত স্থপতির কাছ থেকে নির্ধারিত ফির বিনিময়ে নকশা করিয়ে নিন। মনে রাখবেন একজন স্বল্প প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তি (ড্রাফটসম্যান, ডিপ্লোমাধারী, এমনকি প্রকৌশলীও) এসকল নকশাগত বিধিমালা সম্পর্কে সবক্ষেত্রে সচেতন নন।

এছাড়া ভবনের নকশা অনুমোদন করতেও নকশায় স্থপতির স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। নিশ্চিত হয়ে নিন আপনার ভবনের নকশা করা স্থপতির Institute of Architects Bangladesh-এর সদস্যপদ রয়েছে কী না। শুধুমাত্র সদস্যপদপ্রাপ্ত স্থপতিই আপনার ভবনের নকশা করতে আইনগতভাবে অনুমোদিত।

অনেক ক্ষেত্রে স্থপতি বা স্থাপত্যকাজে নিয়োজিত ফার্মই আপনার নকশার অনুমোদনের কাজটিও করে দিতে আপনাকে সাহায্য করবেন। তবে আপনি চাইলে নিজেও এই কাজগুলো করতে পারেন।

রাজউকে অনুমোদনের ক্ষেত্রে যা যা করতে হবে

১. রাজউক নির্ধারিত ব্যাংক হতে নির্মাণ অনুমোদনপত্র নকশা অনুমোদনের আবেদন ফরম নং-৪০১ সংগ্রহ করতে হবে।

২. সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নকশা অনুমোদন শাখা কর্তৃক নির্ধারিত ফি জমা প্রদান করে ব্যাংক রশিদ সংগ্রহ করতে হবে।

৩. দলিল, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, ডিসিআর, পর্চা ইত্যাদি কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি প্রস্তাবিত ভূমিতে আবেদনকারীর বৈধ মালিকানার স্বপক্ষে দাখিল করতে হবে।

৪. নির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহারের জন্য রাজউক নির্ধারিত ছাড়পত্র, সার্ভিস চার্জ পরিশোধের রশিদ ও ১ কপি প্রস্তাবিত নকশা জমা দিতে হবে। ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন-

  • নগর পরিকল্পনা শাখার ছাড়পত্র- ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে
  • এস্টেট শাখার ছাড়পত্র- রাজউক প্লট অথবা জমির ক্ষেত্রে
  • সংশ্লিষ্ট অফিসের ছাড়পত্র- অন্যান্য সরকারি জমি/প্লটের ক্ষেত্রে
  • বিশেষ প্রকল্প ছাড়পত্র- বৃহদায়তন বা বিশেষ ধরনের প্রকল্পের জন্য (প্রযোজ্য হলে)
  • নির্মাণ অনুমোদন পত্র
  • বসবাস ও ব্যবহার ছাড়পত্র
  • উন্নয়ন অনুমতি পত্র (প্রযোজ্য হলে)

এখানে উল্লেখ্য যে, রাজউকে সাধারণত তিন ধরনের ভূমি চিহ্নিত করা হয়-

  • রাজউক প্লট
  • রাজউক অনুমোদিত আবাসিক প্রকল্পের প্লট
  • ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লট

রাজউক প্লটে বাড়ি নির্মাণ করার জন্য আবেদন করতে রাজউকের এস্টেট শাখা থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। রাজউক প্লট অনুমোদিত বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের প্লট হলে রাজউক নগর পরিকল্পনা শাখার প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লট হলে রাজউক নগর পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র নিতে হবে।

৫. ৮ কপি স্থাপত্য নকশা (প্রণয়নকারী স্থপতি বা প্রকৌশলী, মালিক বা ডেভেলাপারের নাম, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সদস্য নিবন্ধন নম্বর, ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ) নির্ধারিত মাপের কাগজে অ্যামোনিয়া প্রিন্ট করে জমা দিতে হবে।

৬. সাইট প্ল্যান, লে-আউট প্ল্যান, ফ্লোর প্ল্যান, পার্কিং প্ল্যান, লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি ২টি সেকশন ও উন্নতি (Elevation)- এই ড্রয়িংগুলো জমাকৃত নকশার মধ্যে থাকা আবশ্যক। তবে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন সাপেক্ষে আরো ড্রয়িং দেখতে চাইতে পারেন।

৭. এছাড়া নকশার সাথে রাজউকের DAP (Detailed Area Plan) অনুসারে নির্ধারিত কিছু অংশের জন্য Soil Test এর রিপোর্টও জমা দিতে হয়।

রাজউক বিধিমালাতে জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শহরের ঘনত্ব, প্রতিবেশী হিসাবে ভূমির এলাকাভিত্তিক অধিকারসমূহ, অগ্নি নির্বাপণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধিবিধান রয়েছে। একটি বৈধ, কার্যকরী ও বসবাসযোগ্য ভবন তৈরি করতে এটি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।

অনেকেই মনে করেন, ভূমির সেটব্যাক বা সবুজ জায়গা ছেড়ে দেবার কারণে জমি হারানো হচ্ছে। অথচ এই নিয়মনীতি না মেনে চলার কারণে ঢাকা শহরের বসবাসযোগ্য পরিবেশের ক্ষতিসাধন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটি সুন্দর বাড়ি যেমন আপনার স্বপ্ন, একটি সুন্দর বসবাসযোগ্য পরিবেশও সকলের অধিকার। এই আইনগুলো মেনে চলার মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার কর্তব্য।

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

বাড়ি বানাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ওয়েব পোর্টাল- হোম বিল্ডার্স ক্লাব। একটি বাড়ি নির্মাণের পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারও গল্প। তবে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে পদে পদে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই আমরা। এর মূল কারণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ি তৈরির নিয়ম নীতি সম্পর্কে ধারণার অভাব। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে হোম বিল্ডার্স ক্লাব। আমাদের রয়েছে একদল দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এখানে আপনি একটি বাড়ি তৈরির যাবতীয় তথ্য, পরামর্শ ও সাহায্য পাবেন।

© 2020 Home Builders Club. All Rights Reserved by Fresh Cement