ক্লে-ব্রিক ও গ্রিন কনস্ট্রাকশনের আদ্যোপান্ত

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

মানুষ সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মাটি ব্যবহার করে বাসা তৈরি করে থাকে। সভ্যতার ক্রমোন্নতির সাথে সাথে এবং মানুষের বাসা বাড়ি নির্মাণের সুবিধার জন্য মাটিকে রূপান্তর করে সেটাকে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য উপকরণের সন্ধান পায় তারা। সেটা হলো ইট, যা আজকে নির্মাণের পরিভাষায় ক্লে-ব্রিক নামে সর্বাধিক পরিচিত।

ইটের মড্যুলারিটি, ব্যবহারের সুবিধা, কম খরচ, টেকসই ধরন এবং আকৃতি সব কিছু মিলিয়ে একে করে তুলেছে সর্বাধিক পরিচিত এবং ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রী। টেকসই হবার প্রসঙ্গ যখন উঠল, তখন প্রথমে যে কথাটা মাথায় আসে তা হলো, গ্রিন বিল্ডিং। গ্রিন বিল্ডিং কী কী গুণাগুণের জন্য গ্রিন হয় তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমরা আজকে গ্রিন বিল্ডিং বানানোর একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট- গ্রিন কনস্ট্রাকশন নিয়েও আলোচনা করব।

ক্লে-ব্রিক কী? 

ক্লে-ব্রিক হলো একপ্রকারের ইট, যা মাটি কেটে কম্প্রেস করে সেটাকে ছাঁচে রেখে উপযুক্ত আকৃতি প্রদান করে তৈরি করা হয়। এটা মানুষের তৈরি করা অন্যতম প্রাচীন নির্মাণসামগ্রী। নির্মাণ ও ব্যবহারের সহজতা, সহজলভ্যতা, টেকসই প্রকৃতি, আবহাওয়া ও দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি গুণাগুণের জন্য এটি সর্বাধিক প্রচলিত ও পরিচিত একটি নির্মাণ সামগ্রী। দালানের ভেতরে-বাইরে থেকে শুরু করে এমনকি রাস্তার পেভিং ম্যাটেরিয়ালেও ক্লে-ব্রিক ব্যবহার করা হয়। এর ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহারের বহুমাত্রিকতা একে আলাদা একটা পরিচিতি দিয়েছে।  

কীভাবে তৈরি হয়?

 ক্লে ব্রিক খুব সহজেই মাটি ও পানি মিশিয়ে তৈরি করা হয়। এরপরে মিশ্রণটিকে পছন্দসই মাপের ছাঁচে ঢেলে সেটাকে শক্ত করে আকৃতি প্রদান করতে হয়। এই মাটি যাতে আগাছা বা কংকরমুক্ত হয় সেদিকে খুব সচেতনভাবে খেয়াল রাখতে হবে। নাহলে এই ইটের অর্গানিক কম্পোনেন্ট বাসা-বাড়ির ক্ষতি করবে। এই মিশ্রণ তৈরির জন্য যে পানি ব্যবহার করা হয়, সেটাও বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পানি হতে হবে। সাধারণত মিহি দানার টপসয়েল ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে। একে ছাঁচে ঢেলে আকৃতি প্রদান করে এরপরে সেটাকে সাধারণভাবে রোদে শুকাতে হয়। আজকাল ইন্ডাস্ট্রিতে রোদে শুকানো হয় না, আগে চুল্লিতে উত্তপ্ত করে সেটাকে শুকিয়ে এর পরে সেটা রোদে রাখা হয়। চুল্লীতে দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে অতি দ্রুত পোড়ানো না হয়। সেক্ষেত্রে যেই সমস্যাটা হয় তা হলো, দ্রুত সংকোচন ঘটে। ফলে তা ফেটে যেতে পারে। এই জন্য কারখানায় চুল্লী পরিমিত তাপমাত্রায় রাখতে হবে।

 

 ক্লে-ব্রিকের সুবিধা 

  – সাশ্রয়ী 

 – সহজে উৎপাদনযোগ্য

 – দীর্ঘস্থায়ী

 – নির্মাণের জন্য সুবিধাজনক ব্যবহার

 – মডুলার নির্মাণ সামগ্রী, তাই অধিকাংশ স্ট্রাকচারের নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা যায়

 – বিভিন্ন আকৃতিতে তৈরি করা যায়

 – বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন- দালানের অভ্যন্তরের দেয়াল, বাইরের দেয়াল, পেভমেন্ট, জলাশয়ের ঘাট ইত্যাদি নানাবিধ কাজে ব্যবহৃত হয়। 

অসুবিধা

 – জলীয়বাষ্প বাতাস থেকে শোষন করে নেয় ফলে সময়ের সাথে সাথে দুর্বল হয়ে যায়

 – ভঙ্গুর

 – মাটি ও পানির সাথে অর্গানিক উপকরণ জমে স্ট্রাকচার দুর্বল করে দিতে পারে

 – সঠিক ব্যবহার না জানলে ভুল প্রয়োগবিধির জন্য ক্ষতি হতে পারে দালানের

 এবার আসুন আমরা গ্রিন কনস্ট্রাকশন সম্পর্কে জেনে নিই।

 

গ্রিন কনস্ট্রাকশন কী?

 একটি দালানের জীবদ্দশার সম্পূর্ণ সময়কাল ধরে রিসোর্স এফিসিয়েন্ট, এনার্জি এফিসিয়েন্ট এবং পরিবেশ-বান্ধব কিনা তার ভিত্তিতে দালানটিকে গ্রিন বিল্ডিং হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। প্ল্যানিং পর্যায় থেকে শুরু করে নির্মাণ, অপারেশন, মেইন্টেনেন্স এবং সবশেষে ডেমোলিশন পর্যন্ত যদি একটি দালান রিসোর্স এফিসিয়েন্ট, পরিবেশ বান্ধব এবং টেকসই হয় তাহলেই তাকে আমরা গ্রিন বিল্ডিং বলে আখ্যায়িত করে থাকি। এই জন্য নির্মাণ পর্যায়ে যাতে একেবারেই কম কার্বন নিঃসরণ হয় এবং সর্বনিম্ন ওয়েস্ট ম্যাটেরিয়াল বের হয় সেজন্য গ্রিন কনস্ট্রাকশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 এর জন্য প্রয়োজন-

 – স্মার্ট, আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার, যাতে সময় ও লোকবলে সাশ্রয় হয়

 – গ্রিন তথা পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা

 – কনস্ট্রাকশন সিস্টেমকে প্ল্যানিং এর আওতায় আনা

 – অপ্রয়োজনীয় কোন ভাংচুর না করা যাতে ম্যাটেরিয়াল পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়

 – যথাসম্ভব ম্যাটেরিয়াল পুনরায় ব্যবহার করা

 – পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ কনস্ট্রাকশন পিরিয়ডে অপচয় না করা

 – দালানের ভেতর পর্যাপ্ত আলো বাতাস সুনিশ্চিত করা যাতে করে এনার্জি সাশ্রয় হয়

 – কনস্ট্রাকশন ওয়েস্ট যথাযথভাবে ডিসপোজ করা

 – কনস্ট্রাকশন শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা

 – কনস্ট্রাকশন সাইটের আশেপাশের লোকালয়ে মানুষের যাতে সমস্যা না হয় সেটির প্রতি যত্নশীল হওয়া 

 – নন-টক্সিক, নন-ভোলাটাইল অর্গানিক ও লোকাল ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা

 – ইন্টারন্যাশনাল কোড, LEED-এর নিয়মকানুন মেনে সঠিকভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা উপযুক্ত এক্সপার্টের সহায়তায়

 – বিল্ডিং যাতে সহজে মেইন্টেনেন্স এর যোগ্য হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা

 – দালানের নির্মাণ যাতে এনার্জি এফিসিয়েন্ট হয় সেজন্য সোলার প্যানেল, ফ্লো কন্ট্রোলিং ট্যাপ ইত্যাদি আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করা

গ্রিন বিল্ডিং টেকনোলজি ও কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি কেবল পরিবেশবান্ধব নয়, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং বিশ্বের বিভিন্ন নির্মাণ সংস্থা এটি গ্রহণ করছে। এটি আধুনিক উন্নয়নের একটি প্রধান উদাহরণ যা ভবিষ্যতের প্রজন্মের প্রয়োজনের সাথে আপস না করে বর্তমানের চাহিদা পূরণ করে। সেইসাথে এই পদ্ধতি বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়তা করে, যা পরে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহারকে হ্রাস করতে সহায়তা করে। গ্রিন বিল্ডিং টেকনোলজি উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য আশীর্বাদ হিসাবে প্রমাণিত হবে, কারণ এটি শক্তি খরচ সীমাবদ্ধ করতে এবং টেকসই উন্নয়নের প্রচারে সহায়তা করে।

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

বাড়ি বানাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ওয়েব পোর্টাল- হোম বিল্ডার্স ক্লাব। একটি বাড়ি নির্মাণের পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারও গল্প। তবে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে পদে পদে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই আমরা। এর মূল কারণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ি তৈরির নিয়ম নীতি সম্পর্কে ধারণার অভাব। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে হোম বিল্ডার্স ক্লাব। আমাদের রয়েছে একদল দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এখানে আপনি একটি বাড়ি তৈরির যাবতীয় তথ্য, পরামর্শ ও সাহায্য পাবেন।

© 2020 Home Builders Club. All Rights Reserved by Fresh Cement