বাড়ি বানাবেন: জলবায়ুর প্রভাবের কথা ভেবেছেন তো?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

বাংলাদেশে এক সময় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুধাবন করা যেত ঘরের চাল দেখে। একদম নিম্ন আয়ের মানুষেরা ছনের চালের ঘর তৈরি করতেন। আরেকটু অবস্থাসম্পন্ন মানুষেরা করতেন টিনের চাল। সে টিনের চালও আবার অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে একচালা, দোচালা থেকে চৌচালা ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যেত।

তবে এদের মধ্যে একটি সাধারণ মিল হচ্ছে, চালগুলো সমতল হতো না। যখন পাকা ভবন বানানো শুরু হলো, এটিকে বাহুল্য হিসাবে ধরে নেওয়া হলো আর এর জায়গা দখল করে নিল সমতল ছাদ। ছাদে যাওয়ার সুবিধার সাথে বৃষ্টির জন্য সামান্য ঢালু করে দিলেই বৃষ্টির পানি নেমে যেতে পারল। আমাদের এই অঞ্চলে এমন হলেও ইউরোপের ঘরের ছাদগুলো কিন্তু অন্যরকম। সেখানে বেশিরভাগ ঘরের চাল এখনো টালির তৈরি এবং চুড়ার মতো উঠে যাওয়া চাল দেখা যায় সারা ইউরোপেই।

অঞ্চলভেদের এমন পার্থক্যের কারণ কী? এর কারণ মূলত জলবায়ুর বিভিন্নতা। বাংলাদেশে অসমতল চাল প্রয়োজন হয় মূলত বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার সুবিধা করে দিতে। সমতল ছাদে সামান্য কিন্তু সুষম অসমতল তৈরি করে সে চাহিদা মেটানো সম্ভবপর হয়েছে। কিন্তু ইউরোপের তুষারপাত সুলভ শীতের কারণে চালে জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করা ও গলে যাওয়ার সুবিধার্থে প্রয়োজন হয় হেলানো ও টালি দ্বারা তৈরি চাল।

এরকম আরও অনেক ক্ষেত্রেই আপনার ভবন দেখতে ও ব্যবহারের দিক থেকে কেমন হবে তা ঠিক করতে হয় জলবায়ু অনুসারে। তাই ভবন নির্মাণ করতে গেলে অবশ্যই জলবায়ুর বিষয়টি মাথায় রাখতেই হবে। এক্ষেত্রে আসুন এক নজরে দেখে নিই কী কী ধাপ মেনে ভবন নকশা করা দরকারি।

জায়গা বা ‘সাইট’ বিশ্লেষণ

ভবন নির্মাণের আগে স্থপতিকে ওই এলাকার আবহাওয়ার প্রকৃতি, মাটির ধরন, বাতাসের গতি প্রকৃতি, আশেপাশের ভবনের বসবাসের ধরন এবং ভুগোল সম্পর্কে ধারণা রেখে কাজ করতে হবে ও নকশায় তার প্রতিফলন ঘটতে হবে। সফল ও দীর্ঘস্থায়ী ভবনের মালিক হতে স্থপতিকে এসকল ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন করুন ও উৎসাহিত করুন যেন এর প্রতিটি বিষয় মাথায় রাখা হয়।

ভবনের ‘লে আউট’ তৈরিতে জলবায়ু

জলবায়ু ও পরিবেশগত উপাদানই ভবনের প্রাথমিক লে-আউট তৈরির মূল চালিকাশক্তি। যেমন- বাংলাদেশের মৌসুমী জলবায়ুতে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হবার পথে আর গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে বাতাস আসে। শীতকালে বাতাস আসে উত্তর থেকে এবং পশ্চিম দিক থেকে সবচেয়ে বেশি তাপ আসে। তাই যেকোনো লে-আউটে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ঘরগুলোকে দক্ষিণ দিকে স্থাপন করা এখানে আবশ্যক।

সূর্যের গতি প্রকৃতি

জলবায়ু অনুসারে সূর্যের কৌণিক পথ সবসময় আলাদা হয়। তাই ভবন নির্মাণের আগে এই ব্যাপারে বৈজ্ঞানিকভাবে জেনে নেওয়া ও গবেষণা করে নেওয়া দরকারি। সরাসরি সুর্যালোক ঘরে প্রবেশ কমিয়ে ও সূর্যালোকের উজ্জ্বলতা কমিয়ে ভবনের বসবাসকে আরামদায়ক করা যায়। ভবনে ব্যবহৃত সানশেড-লিন্টেল, পোর্চ এবং সোলার প্যানেল (PV প্যানেল) এর অবস্থান ঠিক করতে হবে সূর্যের গতি প্রকৃতির উপর নির্ভর করেই।

দরজা-জানালা

বাংলাদেশে সহজ নির্মাণ, দাম ও বাজারে সুলভ প্রাপ্তির কারনে থাই গ্লাস জনপ্রিয় হলেও, এধরনের জানালা আমাদের দক্ষিণ-পূর্বের বাতাসের আগমনপথ যেমন অর্ধেক করে দেয়, তেমনি সূর্যালোক সরাসরি ঢুকতেও তেমন কোনো বাধা প্রদান করতে পারে না। বাংলাদেশের জলবায়ুগত কারণে এই ধরনের কাঁচের জানালা বা কমার্শিয়াল ভবনে কাঁচের তৈরি দিকগুলো তাপ ধরে রাখে ও এসির উপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ায়। জলবায়ুগত কারণে দরজা ও জানালা সুইং ও কাঠের তৈরি হলে ঘর বসবাসের জন্য আরামদায়ক হয়।

ভৌগোলিক প্রকৃতি ও ভবন

মাটির প্রকৃতির উপরে ভবনের ফাউন্ডেশন বা পাইলিংই শুধু নয়, নকশাও নির্ভর করবে। ঢাকার সমতল ভূমিতে ভবন যেমন হবে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি প্রকৃতিতে একই বিবেচনায় ভবন নির্মাণ করলে সেটি হবে দীর্ঘমেয়াদী একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এছাড়া আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্য মাথায় নিয়ে কাজ না করলেও ভৌগলিক কারণে ভবনের ক্ষতি হতে পারে।

পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ি ঢাল ও পাহাড়ের কারণে ঝড়ের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন মাথায় রাখা যেমন দরকারি, তেমনি সমতলে ভবন নির্মাণের সময় জলাধার ও পানি প্রবাহের অঞ্চল পরিহার করাও অত্যাবশ্যক।

ভবন, জলবায়ু এবং আমাদের ভূমিকা

একটি দেশের স্বাভাবিক জলবায়ুকে ভবন নির্মাণের সময় সম্মান করতে হবে আমাদের নিরাপদে ও দীর্ঘমেয়াদে আরামদায়ক বসবাসের স্বার্থেই। কিন্তু এই জলবায়ু বিশ্বজুড়েই এখন হুমকির সম্মুখীন। অসংবেদনশীলভাবে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের কারণে জলবায়ুর উপরে পড়ছে খারাপ ভুমিকা। একারণে আমাদের দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।

ভবনের ফুটপ্রিন্ট ব্যবহারে সচেতন হোন। দরকারের চেয়ে বেশি জায়গা ধরে ভবন তৈরি করবেন না। ভবনের নির্মাণ সামগ্রীর ক্ষেত্রে ইট বা কংক্রিটের মতো উপাদানের ব্যবহার পরিবেশের কিছুটা হলেও ক্ষতি করে। তাই এই আধুনিক সময়ে স্মার্ট নকশা করান ও স্থপতির সাহায্য নিন।

এছাড়া ভবনের ছাদে ও MGC বা FAR এর অনুমোদিত অংশের বাইরে গাছ লাগান। সারা ভবনের প্লট জুড়ে বেজমেন্ট তৈরি না করে সরকারের নিয়মমতো ২৫% জায়গা পুরোপুরি বৃষ্টির পানি শোষণের জন্য ছেড়ে দিন।

মনে রাখবেন, আপনার ভবনে আপনি কতটা আরামদায়কভাবে থাকবেন তা বেশি স্কয়ার ফুট জায়গার চেয়েও বেশি নির্ভর করে আপনি এলাকার জলবায়ুর সাথে ভবনকে কতটা মানানসই হিসাবে তৈরি করতে পারছেন তার উপর। তাই সংবেদনশীল হোন। নিজে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভবন তৈরি করুন। আর আপনার শহর, দেশ ও বিশ্বের মানুষকে সহায়তা করুন একটি আরামদায়ক জীবন পেতে।

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

বাড়ি বানাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ওয়েব পোর্টাল- হোম বিল্ডার্স ক্লাব। একটি বাড়ি নির্মাণের পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারও গল্প। তবে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে পদে পদে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই আমরা। এর মূল কারণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ি তৈরির নিয়ম নীতি সম্পর্কে ধারণার অভাব। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে হোম বিল্ডার্স ক্লাব। আমাদের রয়েছে একদল দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এখানে আপনি একটি বাড়ি তৈরির যাবতীয় তথ্য, পরামর্শ ও সাহায্য পাবেন।

© 2020 Home Builders Club. All Rights Reserved by Fresh Cement