জমি কিনবেন: যা যা করা লাগবে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে মৌলিক অধিকার হিসাবে বাসস্থানের কথা থাকলেও, নিজের জমিতে নিজের বাসস্থান বিলাসিতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। প্রায় ২ কোটি লোকের ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকায় নিজের জমি শুধু বিলাসিতাই নয়, অনেক সময় প্রায় সোনার হরিণও বলা যায়।

তবে জমির জন্য মানুষের সঞ্চয় বা বিনিয়োগ যেহেতু থেমে নেই, তাই থেমে নেই জমির বেচা-বিক্রিও। বসতবাড়ির জন্য নির্ভেজাল এক টুকরো জমির চাহিদা ঢাকার সীমানা পার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিভাগ বা জেলা শহরগুলোতেও।

কিন্তু জমি কেনা মানে তো শুধু কিছু টাকার লেনদেন নয়। টাকা-পয়সার হিসেব মিলে গেলে শুরু হবে মালিকানা ও দলিল দস্তাবেজ নিয়ে অনেক অনেক কাজ। শুধুমাত্র পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে অনেকেই শরণাপন্ন হন দালালের। এর ফলে অপচয় হয় নিজের সময়, অর্থ এবং মূল্যবান মানসিক শান্তি। অনেক সময় তারপরও ঝামেলামুক্ত কেনাবেচা নিশ্চিত করা যায় না। জমি কেনার ক্ষেত্রে আপনাকে প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে রাখতে হবে সম্যক ধারণা। এজন্য একটি চেকলিস্ট করে মিলিয়ে নিতে হবে প্রতিটি ধাপ। কী কী থাকবে সেই তালিকায়?

বিদ্যমান তথ্যাদি

জমির ক্রেতা হিসাবে প্রথমে বিক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি সকল কাগজপত্র চেয়ে নিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে-

  • জমির সকল খতিয়ান (CAS, RAS, SA এবং BS খতিয়ান)। 
  • জমিটি সরকারের তালিকাভুক্ত হবার পর যতবার কেনাবেচা হয়েছে সম্ভবপর সকল দলিল।

এই সকল কাগজ দেখে প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিন আপনি যার কাছ থেকে জমি কিনছেন, তিনি (এবং তার শরীকেরা) বর্তমানে জমির প্রকৃত মালিক। এছাড়া খতিয়ানের তথ্যাদির ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কিনা তা-ও যাচাই করতে হবে। 

এখানে লক্ষ্যণীয় কয়েকটি বিষয় হলো-

  • মৌজা নকশা ছাড়া খতিয়ান অর্থহীন। 
  • তেজগাঁওয়ের ভূমি জরিপ ও রেকর্ড অফিস থেকে নির্দিষ্ট ফি-র বিনিময়ে যেকোনো জমির নকশা সংগ্রহ করা যায়। ঢাকার বাইরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এই সরবরাহের কাজ করে। 
  • যেসকল জমির মৌজার চূড়ান্ত প্রকাশনা সম্পন্ন হয়েছে সেগুলার ফটোকপি পাওয়া সম্ভব।

নামজারি

পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে চলে যান সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী ভূমি কমিশনারের অফিসে। খোঁজ নিন জমিতে মালিক হিসেবে কার নামজারি করা রয়েছে। যদি সকল কাগজপত্র সঠিকও থাকে, তবুও বিক্রেতার নামে নামজারি থাকা আবশ্যক।

যদি সেটা করা না থাকে, তাহলে বিক্রেতাকে বলুন তার নামে বিক্রির আগে জমির নামজারি করিয়ে নিতে। নামজারিকে অনেক ক্ষেত্রে মিউটেশনও বলা হয়ে থাকে। নিজে থেকে গিয়ে নামজারি না করালে এই তথ্য হালনাগাদ থাকে না। কারণ সরকারিভাবে ২০ বছরের আগে জরিপ করা হয় না। আর মিউটেশন না থাকলে খাজনা দেওয়া যায় না।

খাজনা

মনে রাখবেন, জমির মালিকানা আসলে সরকারের কাছ থেকে জমির এক ধরনের ইজারা নেওয়া মাত্র। সুতরাং, অবশ্যই জমির বিপরীতে ভূমিকর দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। জমি কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন বর্তমান মালিক জমির খাজনা হালনাগাদ করেছেন। খাজনা পরিশোধের সকল কাগজপত্র বিক্রেতার কাছ থেকে চেয়ে নিন (মূলকপি সম্ভব না হলে ফটোকপি, তবে মূলকপি নিজে দেখে নেবেন) এবং যথাযথভাবে সংরক্ষণ করুন। 

সাব রেজিস্ট্রি অফিস

সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে NEC সংগ্রহ করতে হবে। একে বাংলায় বলা হয় নির্দায় সনদ। এই অফিসে, বিগত ১২ বছরে জমিটির হেবা, দান, বিক্রি বা এওয়াজমূলে হস্তান্তর নিয়ে তথ্য থাকবে ও সর্বশেষ মালিকের নামের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। 

হিস্যাবণ্টন নিশ্চিতকরণ

একটি জমি অনেক ক্ষেত্রেই ভাগাভাগির ফলে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছায়। কিন্তু সেই অনুসারে দলিলাদি নিশ্চিত করা থাকে না। শরীকদের সঙ্গে বিক্রেতার অংশনামা রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করে মিলিয়ে দেখতে হবে যে, বিক্রেতা তার প্রাপ্য অংশই শুধু বিক্রি করছেন। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে উপরের ধাপ অনুসারে বিক্রেতার নামজারি করতে হবে ও শরীকদের নাম নিশ্চিত করতে হবে। 

পরিত্যক্ত পরীক্ষাকরণ

তিনটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হওয়ার ব্যাপারে ক্রেতাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে।

  • জমিটি কোনভাবে খাস কিনা।
  • জমিটি পরিত্যাক্ত বা শত্রু সম্পত্তি কি না।
  • কোনো কারণে সরকার জমিটি অধিগ্রহণ করেছে কি না।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসন (ভূমি) বা সিটি কর্পোরেশনে খোঁজ নিলে এই সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে।

বন্ধকী

জমির উপরে কোনো ব্যক্তিকে বিক্রয় বা রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা (Power of Attorny) অর্পণ করা আছে কিনা সেটিও যাচাই করে নিতে হবে। এছাড়া জমি দেখিয়ে বা বন্ধক রেখে কোনো ব্যাংক, বীমা বা অন্য ধরনের অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ বা অন্য কোনো ধরনের সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে এবং খোঁজ নিতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে। 

সরেজমিনে দেখা

সকল কাগজ সঠিক থাকা সাপেক্ষে ক্রেতাকে জমিতে সরেজমিনে যেতে হবে এবং জমির অস্তিত্ব ও কাগজপত্রের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে যা যা দেখা প্রয়োজন তাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়।

  • জমি- জমির ব্যাপারে যা যা দেখতে হবে-

১. কাগজপত্রে উল্লেখিত দাগ ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে দেখতে হবে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত জমি আর দেখানো জমি একই কিনা। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের আমিনের সহায়তা নিন। 

২. আশেপাশের মানুষের সাথে কথা বলে আপনার জানা তথ্যসমূহের (জমির ইতিহাসসহ) প্রতিটির ব্যাপারে আবারো নিশ্চিত হোন। 

৩. জমির সংযোগ রাস্তার অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিন। রাস্তার ব্যাপারে ভবিষ্যৎ কোনো প্রস্তাবনা আছে কিনা তা-ও জেনে নিন। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা বর্ধনের প্রস্তাবনা থাকতে পারে, যাতে ক্রেতাকে জমির অংশ ছাড়তে হতে পারে। এ ব্যাপারে আগেই নিশ্চিত হওয়া উচিত। 

৪. জমির ব্যাপারে কোনো মামলা-মোকদ্দমা আছে কিনা সে ব্যাপারেও খোঁজ নিন। 

  • বিক্রেতা-  বিক্রেতা ও জমির উপর তার অধিকার নিয়ে নিচের বিষয়গুলো দেখতে হবে-

১. জমির উপর বিক্রেতা বলে যিনি নিজেকে দাবি করেছেন তার বিক্রির পর্যাপ্ত অধিকার আছে কিনা।

২. জমির মালিক সাবালক ও মানসিকভাবে সুস্থ কিনা। নাবালক মালিকের জমি আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক নিযুক্ত করে বেচাকেনার বিধান রয়েছে।

৩. জমির মালিকের কাছ থেকে সরাসরি মৌখিক সম্মতি নেওয়া যে তিনি জমি বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

জমির কোনো বিষয় সম্পর্কে সামান্য পরিমাণ সন্দেহের উদ্রেক হলেও জমি বায়না করার আগেই, পত্রিকায় আইনগত বিজ্ঞপ্তি দিন। এতে করে অন্য কেউ মালিকানা দাবি করতে চাইলে আগেভাগেই তা করতে পারবে এবং আপনি মামলা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। 

নোটিশ

আইন অনুসারে জমি বায়না করার আগে জমির মালিক ও প্রত্যেক শরীককে নোটিশ দিন। এই প্রক্রিয়া আপনাকে পরবর্তীতে হয়রানি মামলা থেকে রক্ষা করবে। পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতে দলিল প্রণয়ন ও মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কারো উপস্থিতি আপনার প্রয়োজন হবে। 

উপরে সকল প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ মনে হলেও শুধু নামজারি পেতেই কিছুটা সময় বেশি লাগতে পারে। বাকি সকল প্রক্রিয়া একজন দক্ষ কনসালট্যান্ট এবং দেওয়ানী আইনে অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীর পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে করতে পারলে সম্পূর্ণ বৈধভাবে মাত্র দুই থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

জমি কেনার ব্যাপারটি শুধু এখন একটি জীবনভর লালিত স্বপ্নই নয়, অনেক ক্ষেত্রে একটি স্মার্ট বিনিয়োগ। তাই বিনিয়োগের পূর্বে সেটি নিয়ে যথার্থভাবে যাচাই-বাছাই একটি কঠিন প্রক্রিয়া হলেও, তা দেখে, শুনে ও বুঝে নেওয়া একজন স্মার্ট বিনিয়োগকারী হিসাবে আপনার কর্তব্য! 

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

বাড়ি বানাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ওয়েব পোর্টাল- হোম বিল্ডার্স ক্লাব। একটি বাড়ি নির্মাণের পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারও গল্প। তবে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে পদে পদে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই আমরা। এর মূল কারণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ি তৈরির নিয়ম নীতি সম্পর্কে ধারণার অভাব। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে হোম বিল্ডার্স ক্লাব। আমাদের রয়েছে একদল দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এখানে আপনি একটি বাড়ি তৈরির যাবতীয় তথ্য, পরামর্শ ও সাহায্য পাবেন।

© 2020 Home Builders Club. All Rights Reserved by Fresh Cement