কীভাবে বাড়ির নকশা আপনাকে দেবে সর্বোচ্চ আলো বাতাসের নিশ্চয়তা?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই আমাদের জলবায়ুর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ হলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আমাদের তাপমাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যার ফলে এখন কৃত্রিম উপায়ে আমাদের ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ শীতল করতে হয়। এতে আমাদের স্বপ্নের বাড়ির ইউটিলিটি বিল যেমন একদিকে লাগামছাড়াভাবে বেড়ে যায়, ঠিক তেমনিভাবে আমাদের ঘরের বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রাও বেড়ে যায়।

প্রাকৃতিক আলো বাতাসের সাথে আমাদের শারীরিক সুস্থতাও একই সুতোয় গাঁথা। এজন্য কৃত্রিম উপায়ের আলো বাতাসের চেয়ে প্রাকৃতিক আলো বাতাস বাসা-বাড়িতে অতি আবশ্যক। বাসার ভেতরে প্রাকৃতিক আলো বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অবশ্যই নকশা প্রণয়নের সময়েই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবেই সর্বোচ্চ আলো-বাতাস এর আগমন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আসুন জেনে নিই কীভাবে সঠিক বাড়ির নকশার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়।

নকশা প্রণয়নের আগে যা যা খেয়াল রাখতে হবে

আমাদের আগে জানতে হবে কী কী ভৌগোলিক এবং আঞ্চলিক কারণে আলো ও বাতাসের প্রবাহের দিক এবং পরিমাণ নির্ভর করে। আগেই বলা হয়েছে, আমাদের দেশে বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে বায়ু সারা বছর প্রবাহিত হয়। এবং ভৌগলিক অবস্থানগতভাবে আমাদের উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে গেছে, ফলে আমরা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর অন্তর্গত। আমাদের আবহাওয়া মূলত গ্রীষ্মপ্রধান।

এজন্য আমাদের নকশা করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে বায়ুপ্রবাহ কক্ষের সর্বোচ্চ এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বের হয়ে যেতে পারে এবং ঘরে দরজা-জানালা এমন স্থানে দিতে হবে, যাতে করে দিনের বেশিভাগ সময় সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করতে পারে, আবার ঘর যাতে অতিরিক্ত তাপ নিয়ে উত্তপ্ত না হয়ে যায়।

সূর্যালোক কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে

এর জন্য আমাদের খুব সাধারণ জ্ঞান প্রয়োজন। সূর্য আমাদের দেশের ওপর পূর্ব দিকে উঠে খানিকটা দক্ষিণে হেলে পশ্চিম দিকে অস্তমিত হয়। এজন্য সূর্যরশ্মি তীর্যকভাবে আমাদের ঘরে পতিত হয়। এই প্রবাহ পথ সঠিকভাবে জানা থাকলে আমরা যেমন প্রয়োজনীয় সূর্যালোক নিশ্চিত করতে পারব, ঠিক তেমনভাবে আমরা আমাদের ঘরের নকশার সঠিক প্রণয়নের মাধ্যমে ঘরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিও প্রশমিত করতে পারি। আসুন এই বিষয়গুলি সম্পর্কে আমরা জেনে নিই।

১. সকালের সূর্যালোকের তাপ কম থাকে কারণ তা বাতাসকে উত্তপ্ত করার সময় কম পায়। সেজন্য আমাদের ঘরের যে স্থানগুলো সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়, যেমন- বেডরুম, পড়ার ঘর ইত্যাদি, উত্তর, পূর্ব কিংবা দক্ষিণে দিলে সেখানে আলো যেমন বেশি আসবে তেমনভাবে সেই ঘরগুলো কম উত্তপ্ত হবে।

২. পশ্চিম দিকে সূর্যালোক বেশি তির্যক এবং সেজন্য এর তাপও বেশি থাকে। সেজন্য যে ঘরগুলোর ব্যবহার তুলনামূলক কম করা হয়, সেগুলোর অবস্থান পশ্চিমের দিকে হলে একইভাবে তাপমাত্রা কম প্রভাব ফেলে, যেমন- রান্নাঘর, স্টোররুম ইত্যাদি।

৩. উত্তরে সরাসরি সূর্যালোক আসে না, ডিফিউজড হয়ে আসে, সেজন্য উত্তরের আলো চোখের উপর গ্লেয়ার করে না। এজন্য পড়াশোনার কাজ উত্তরদিকের স্থানে করতে পারলে সহজতর হয়। এই একই কারণে উত্তর দিকে সানশেডের প্রয়োজন কেবল বৃষ্টির ছাঁট থেকে ঘরকে রক্ষা করতে।

৪. দক্ষিণে গ্লেয়ার হয়, তাই গ্লেয়ার ঠেকাতে সানশেড, ব্লাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়।

৫. পরিষ্কার স্বচ্ছ জানালা দিয়ে আলো প্রবেশ বেশি হয়। দিনের উল্লেখযোগ্য সময় জানালা খোলা রাখলে এবং সম্ভব হলে দরজা খোলা রাখলে ঘরে আলো প্রবেশ বেশি হয়। ফলে ঘর হয়ে উঠে স্বাস্থ্যকর এবং আলোকিত। সূর্যরশ্মির মধ্যে থাকে ভিটামিন-ডি এবং এর ইউভি রশ্মি একটি পরীক্ষিত জীবাণুনাশক। তাই ঘরের মধ্যে অবশ্যই পর্যাপ্ত আলোর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. দালানের চারিদিকের সেটব্যাক নিশ্চিত করবে আপনার নিজের বাড়ি এবং পাশের বাড়ির পর্যাপ্ত আলোর প্রবেশ। সেজন্য উপযুক্ত সেটব্যাক অবশ্যই রাখতে হবে।

৭. অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভবনে জলছাদ, ডাবল সিলিং, সাস্পেন্ডেড সিলিং ইত্যাদির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৮. জানালা ছাড়াও তাপ প্রতিহত করতে এবং একইসাথে সূর্যালোক নিশ্চিত করতে উপযুক্ত স্থানে বারান্দা নকশায় থাকলে তা বাড়িকে আলোকজ্জ্বল করে তোলে।

বায়ুপ্রবাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে

বায়ুপ্রবাহ সুনিশ্চিত করার জন্য আমাদেরকে প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো, প্রতিনিয়ত বায়ুপ্রবাহ যাতে সচল থাকে সেজন্য বায়ুপ্রবাহের পথ করে দেয়া এবং সেই পথ যাতে সচল, বাধামুক্ত যাতে থাকে সেব্যাপারে সঠিক নকশা প্রণয়ন করা। এর জন্য নকশা পর্যায়ে ঘরের জানালার অবস্থান, আকৃতি ইত্যাদি বায়ুপ্রবাহের দিকের সাথে সঠিক পথে দিতে হবে, এবং এই পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কোনো কিছু রাখা যাবে না। বায়ুপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

১. প্রথমেই, আমাদের যা জানা দরকার তা হলো বায়ুপ্রবাহের দিক। আমাদের দেশে বছরের অধিকাংশ সময় দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় সমগ্র দেশের উপর দিয়ে। শীতকালে উত্তর দিক থেকে বায়ু প্রবাহ হয়, যা মূলত আমাদের উত্তরের হিমালয়ের দিক থেকে ঠাণ্ডাভাব বয়ে নিয়ে আসে।

২. বাড়ির যেকোনো দিকেই জানালা দেয়া যায়, এতে করে ঘরের মধ্যে বায়ুপ্রবাহ নিশ্চিত হয়। কিন্তু ঘরের উত্তর এবং দক্ষিণে খোলা রাখলে ক্রসভেন্টিলেশন নিশ্চিত হয়। এর ফলে ঘরের মধ্যকার কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ বদ্ধ বাতাস প্রবাহিত হয়ে বাইরে যায় এবং ঘরের ভেতর অক্সিজেন সমৃদ্ধ সতেজ বাতাস প্রবাহিত হয়ে প্রবেশ করে।

৩. গরম বাতাস হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং নিচে শীতল বাতাস অবস্থান নেয়। এজন্য জানালা খোলা রাখার পাশাপাশি ভেন্টিলেটর বা ঘুলঘুলিও ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪. বায়ুপ্রবাহের পথে উঁচু আসবাবপত্র রাখা উচিৎ না, এতে করে বায়ুপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়।

৫. দুটি দালানের মাঝে পর্যাপ্ত সেটব্যাক থাকলে এই পথ দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হতে পারে খুব সহজেই এবং দুটি দালানকেই পর্যাপ্ত শীতল করতে পারে, সেজন্য সেটব্যাক অবশ্যই দিতে হবে। এতে করে বায়ুপ্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

৬. উত্তর-দক্ষিণে বড় খোলা জানালা দেয়া অনেক সময়েই সম্ভব হয় না নানাবিধ কারণে। সেজন্য পূর্ব ও পশ্চিমে আকারে বড় কিংবা ছোট যেভাবেই হোক, প্রয়োজন অনুসারে স্থপতির সাথে পরামর্শ করার সাপেক্ষে জানালা, বারান্দা দিতে হবে।

প্রাকৃতিক বায়ু এবং আলোর সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে ইউটিলিটি বিলের পরিমাণ যেমন কম আসবে ও আমাদের অর্থনৈতিক চাপ কমবে ঠিক তেমনিভাবে আমাদের বাসাবাড়ি হয়ে উঠবে স্বাস্থ্যকর, মনকে রাখবে সতেজ এবং খোলামেলা। আর বাসা হয়ে উঠবে আমাদের সত্যিকারের স্বপ্নের আবাসন।

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

বাড়ি বানাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ওয়েব পোর্টাল- হোম বিল্ডার্স ক্লাব। একটি বাড়ি নির্মাণের পেছনে জড়িয়ে থাকে হাজারও গল্প। তবে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে পদে পদে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই আমরা। এর মূল কারণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ি তৈরির নিয়ম নীতি সম্পর্কে ধারণার অভাব। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে হোম বিল্ডার্স ক্লাব। আমাদের রয়েছে একদল দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এখানে আপনি একটি বাড়ি তৈরির যাবতীয় তথ্য, পরামর্শ ও সাহায্য পাবেন।

© All Rights Reserved by Home Builders Club